মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার পটভূমি

সেনবাগ নোয়াখালী জেলার একটি থানা, বর্তমানে উপজেলা। নোয়াখালী জেলা প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে বঙ্গপোসাগরের গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দির শুরুতে মিথিলা আগত বিশ্বম্ভরশুর বর্তমান নোয়াখালীতে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ রাজ্যের নাম দেয়া হয় ভুলুয়া। এই ভুলুয়া রাজ্যটি পরবর্তীতে সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য ও আভিজাত্যে সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠে। এই ভুলুয়াকে নিয়ে কবি শেখ সাদী লিখেছেন- ভুলুয়া শহর হয় অতি দিব্যস্থান, // সেই সে শহর হয় অতি ভাল জান। // সৈয়দ কাজী আছে যত মুসলমান, // নানা জাতি আছে যত ব্রাম্মন সজ্জন।

ভুলুয়া অঞ্চলের লবন এজেন্ট লর্ড প্লাউডেন ১৮২১ সালে ভুলুয়াকে একটি জেলা ঘোষনা করার প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাব অনুসারে বৃটিশ সরকার তাঁকে কালেক্টর নিয়োগ করে সিমানা নির্ধারণ করে দেয়। বর্তমান চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ সহ বৃহত্তর নোয়াখালীর সকল উপজেলা এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই এর অন্তর্ভূক্ত ছিলো।

সেনবাগ বেগমগঞ্জ থানার একটি অংশ ছিল, বেগমগঞ্জ ও সেনবাগের মৌজাগুলি একই ক্রমিকে বিদ্যমান। সেনবাগের পূর্ব উত্তর কোনে আইন শৃংখলার অবনতি ঘটায় সুদূর বেগমগঞ্জ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতোনা বিধায় এই এলাকার নিজ সেনবাগ গ্রামে বাঘরা দিঘীরপাড়ে একটি ফাঁড়ি থানা স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে সেনবাগকে পুর্নাঙ্গ থানায় রুপান্তরিত করার লক্ষ্যে নিজ সেনবাগের নিজ শব্দটি বাদ দিয়ে সেনবাগ থানা ঘোষনা করা হয় ১৯২২ সনে। মিরগঞ্জ বাজারে (বর্তমানে সেনবাগ বাজার) থানা সদর স্থাপিত হয়। তখন এই মিরগঞ্জ বাজারে পাঠশালা তদারকের জন্য সার্কেল পন্ডিতের অফিস ও সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস ছিল, সেনবাগ সদরে অবস্থিত অগ্রনী ব্যাংকের শাখা মিরগঞ্জ বাজার শাখা হিসেবে লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়। সেনবাগ সদরের সুপার মার্কেটটির নাম ও মিরগঞ্জ বাজার হিসাবে লেখা আছে।প্রাচীন ইতিহাসে দেখা যায় এই অঞ্চলের মাঝ দিয়ে ভুলুয়া খাল প্রবাহিত ছিল। পূর্বে ফেনী নদী এবং পশ্চিমে মেঘনা। বড় বড় পুকুর কাটার সময় পুকুরের তলদেশে নৌকার বৈঠা এবং নৌকার গোলই (নৌকার সম্মূখ অংশ) পাওয়া গেছে। এতেই বোঝা যায় এই এলাকা এক সময় গভীর পানির নিচে ছিলো। মেঘনা ও ফেনী নদীতে বাঁধ দেয়ার ফলে পলি মাটি জমে জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে।ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে সেনবাগ ২২.৫৯ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশে এবং ৯১.১৪ ডিগ্রী দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত।

প্রাচীন কীর্তিঃকল্যান্দি বলতে কল্যান্দি বাজার নিয়ে কিছু এলাকাকে কল্যান্দি বলা হয়। উত্তর শাহাপুর দক্ষিণ শাহাপুর এবং মোহাম্মদপুর গ্রামের কিছু অংশকে কল্যান্দি বলা হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, খাজনা আদায়ের অফিসকে বলা হতো ‘ডিহী এবং এই ডিহীর দায়িত্ব ছিলেন কল্যাণ নামে জনৈক ব্যক্তি। এই কল্যাণ ডিহী পরবর্তীতে কল্যান্দিতে রুপান্তরিত হয়। কল্যান্দি বাজারের খালের উত্তর পাশের বাড়িতে সেই কুটি বাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান। ভূঞার দিঘী, কাদরার কিললা, ছমিরমুন্সিরহাট মসজিদ বীরকোটের বীরের মূর্তি প্রাচীন কীর্তির প্রমান পাওয়া যায়।

সংস্কৃতিঃসেনবাগ মাত্র ১৫৮ বর্গ কিলোমিটারের একটি জনপদ। এই এলাকার হিন্দু জমিদার এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু। জমিদারী প্রথা অনুসারে প্রতি বছর প্রজা প্রতিপালন উৎসব পালন করা হতো। এই উৎসবে যাত্রা, পালাগান ও বিভিন্ন প্রকার সঙ্গীতের আয়োজন করা হতো। এতে প্রভাবশালী মুসলমানরাও অংশ গ্রহণ করতো, বীরকোট, কাচারী বাড়ি (বর্তমান তফসিল অফিস) মোহাম্মদপুর শশী চৌধুরী বাড়ি, হেম চৌধুরী বাড়ি, বক্সিরহাট করুনা চৌধুরী বাড়িতে এই আসর বসতো। হাবিব উল্যা চৌধুরী, মকবুল চৌধুরী, মীরু মিয়া, ফজল মাষ্টার, কাশেম মিয়া সহ কতিপয় মুসলমান সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকতেন এবং মঞ্চে অভিনয় করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৪ সনে সেনবাগ সদরে তমদ্দুন মজলিশ নামে একটি সংগঠন সৃষ্টি হয়। ১৯৮৩ সনে উপজেলা পদ্ধতি চালু হওয়ার পর শিল্পকলা একাডেমী গঠন করার পর এই সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটে।

এই অঞ্চলে বিয়ে শাদী, জন্ম, খতনা নিয়ে অনেক উৎসব পালন করা হয়। বিয়ে বাড়িতে বর আগমনের জন্য কলাগাছ দিয়ে তোরন নির্মাণ করে বরকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। বর পক্ষ এবং কনে পক্ষের মধ্যে গজল আকারে প্রশ্ন উত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করতে হয়। তোরনের দুই পাশে দাড়িয়ে প্রশ্ন উত্তর শেষে জয় পরাজয় নির্ধারন করে তোরনের মধ্য দিয়ে শরবত যাওয়ায় প্রবেশ করতে হত।

কনে পক্ষ-             আচ্ছালামু আলাইকুম এবা, দুলা আইছে বিয়া কইত্তো, তোমরা আইছো কেবা?

বর পক্ষ-              ওয়ালাইকুম ছালাম ওবা, দুলা আইছে বিয়া কইত্তো আমরা আইছি শোবা,

কনে পক্ষ-            লোহার সিন্দুক হিতলের তালা, দুলাভাই গরে আইতে বিষন জ্বালা

বর পক্ষ-              করাচির চাবি লন্ডনের তালা, গরের বিতরে যাইতে কত লাগে বালা

কনে পক্ষ-            গরে গরম বাইরে ঠান্ডা, দুলাভাই খাড়াই থান দুই চার ঘন্টা।

বর পক্ষ-              উলি গাছের তুলি, আসমান গেছে ঢুলি, কোন ভাবিসাব গরে আছেন, দুয়ার দেন গো খুলি।

এরপর মুরব্বিদেরদের একজন এসে এই বিতর্ক থামায়ে দিয়ে বরকে ভেতরে নিয়ে যান। এরপর শালা শালিরা সম্মানী দাবী করে গানের ভাষায়- আহারে নওশা সাজিলি ভরসা, সম্মানী কি ধন চিনলিনারে, সম্মানী যদি রাখতে চাওরে, ১০০ টাকা ফেলিয়া দাওরে।